'যার বিয়ে তার মনে নেই, পাড়া পড়শির ঘুম নেই'
প্রবাদটা বেশ প্রচলিত। জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ রাজনীতি করে। সে-ক্ষমতায় যেতে পারবে কি পারবে না এটা নিয়ে অনেকেরই মাথা ব্যাথা। জামায়াত ক্ষমতায় না যাক তারা চায় কিন্তু তারা ক্ষমতায় গেলে তাদের মাথা ব্যাথার কারন তো অনেক। জনগণের ঘাড়ের উপর বসে কর্তৃত্ব নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে জামায়াত ইসলামী বড় বাধা। কারন জামায়াত আল্লাহর জমীনে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তারা আল্লাহর আইন ও সৎ লোদের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধ পরিকর। কাজেই যারা নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য ক্ষমতা, আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করতে চায় তাদের জন্য জামায়াতে ইসলামী বড় বাধা।
অনেকে মনে করেন, জামায়াত কখনো ক্ষমতায় যেতে পারবে না । কারন তাদের '৭১ এর ভূমিকা। আমি সে কথায় পরে আসছি। জামায়াত কি সত্যিই ক্ষমতায় যেতে চায় ? যদি চাইতই তাহলে এ দলের নেতৃত্ব যদি পাওয়ার পর (আমীরে জামায়াতসহ সর্বস্তরের নেতারা)
শপথের সময় কেন কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে? আসলে এটা নেতৃত্ব নয় বরং দায়িত্বের অনেক বড় বোঝা কাঁধের ওপর এসে পড়ে, যে দায়িত্বের অনুভূতি প্রকাশ করেছেন খলিফাতুল মুসলেমীন হযরত ওমর ফারুক (রাঃ)। তিনি বলেছেন, ফোরাতের তীরে যদি একটা কুকুরও না খেয়ে মারা যায় তার জন্য ওমর কে জবাবদিহী করতে হবে। এটা একটা আমানত।
ইমানের ঘোষনা দেওয়ার পর যেমন এ আমানত থেকে সরে আসার সুযোগ নেই তেমনি দায়িত্ব আসার পর সঠিকভাবে পালন করা ছাড়া কোন পথ নেই । বোখারী শরীফের হাদীসে বলা হয়েছে-“ তোমরা সবাই আমানতদার আর এ আমানতের ব্যাপরে সবাইকে জবাবদিহী করতে হবে।” একটা দলের দায়িত্বের বোঝা যারা বহন করতে ভীত সন্ত্রস্থ হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে, তাদের পক্ষে গোটা দেশের, দায়িত্ববহন করার খায়েশ কেমন করে হবে? কিন্তু এই কাজটা তাদের করতে হয় ইমানের দাবী পুরনের জন্য।
ইসলামী আন্দোলন তথা জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ আল্লাহ ফরজ করেছেন। আর ইসলামী আন্দোলনের সর্বশেষ ও চড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে নেতৃত্বের আমুল পরিবর্তন করে মানুষের সমাজের সকল দিক এবং বিভাগে অসৎ, পাপীষ্ঠ লোকদের নেতৃত্ব নির্মূল করে সেই জায়গায় সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। কোরান ও হাদীসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের এটাই একমাত্র উপায়। কাজেই এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতার রাজনীতি করে না, বরং সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, আমাদের একমাত্র অনুকরণীয় আদর্শ হযরত মুহম্মদ (স.) এর পদাঙ্ক অনুসরন করে। যিনি ছিলেন মানুষের প্রতি অত্যন্ত কল্যাণকামী, রহমদিল।
আল্লাহর ভাষায়:
"তোমাদের কাছে তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রসুল এসেছেন। তোমাদের যা কিছু বিপর্যন্ত কবে তা তার জন্য কষ্টকর। সে তোমাদের কল্যাণ-কামী, মুমিনদের প্রতি অতীব দয়ালু, পরম করুণাময়।" (সুরা আত তওবা-১২৮)
কোরানের ঘোষনা মতে রসুল (স.) এর পরে উম্মতে মুহাম্মদী হিসাবে এটি আমাদের দায়িত্ব। আল্লাহ বলেনঃ
“এভাবে আমি তোমাদের একটি উত্তম জাতি হিসাবে গড়ে তুলেছি- যাতে করে তোমরা গোটা মানবজাতির জন্য সত্যের সাক্ষ্যদাতা (বাস্তব নমুনা) হতে পারো এবং রসূল (স.) যেন তোমাদের জন্য সাক্ষ্য বা নমুনা হন।"
(সুরা আল বাকারা-১৪৩)
হে ঈমানদারগন! তোমরা আল্লাহর জন্য সত্যের সাক্ষী হয়ে দাড়াও।"
(সুরা আল মায়েদা: ৮)
এর থেকে পরিষ্কার হয়ে যায় জামায়াত শুধুমাত্র ক্ষমতার রাজনীতি করে না। বরং আল্লাহর হুকুম পালন করে। সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদূদী (রহঃ) এক বিশেষ প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এরপর ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের জন্ম হয়। এ দলের সুচনা লগ্নে তিনি বলেছিলেন: আমরা এমন এক ভূখন্ড চাই যেমানে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব থাকবে । পাকিস্তান ইসলামের নামে অর্জিত হলেও সেখানে ইসলাম কায়েম হয় নি। এজন্য তখনও জামায়াত ইসলামীকে আন্দোলন সংগ্রামে থাকতে হয়েছে। জেল যুলুমের শিকার হতে হয়েছে। এরপর ১৯৭১ এ ভারতের অভিভাবকত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হোক এটা জামায়াত চায়নি। কি কারনে সেটা ২০২৪ শে মানুষ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের সুচনা লগ্ন থেকে জামায়াত বাংলাদেশের বাস্তবতা মেনে নিয়ে এদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী হিসাবে স্বাধীনতা স্বার্বভৌমত্ব রক্ষার দায়িত্ব পালন করেছে। ইতিহাস স্বাক্ষী যে কোন স্বার্থের জন্য নয়- ইমানী দায়িত্ব হিসাবে তাদের দায়িত্ব পালন করেছে।
জামায়াতের অসংখ্য বই-পুস্তক নেতৃবৃন্দের বক্তব্যে এসব বিষয় সুস্পষ্টভাবে উঠে এসছে। শত যুলুম নির্যাতনের পরেও তারা পিছু হটেনি। এই দেশপ্রেম ইমানের দাবী। লোক দেখানোর জন্য বা দুনিয়ার কোন স্বার্থ উদ্ধারের জন্য নয়। বরং আদালতে আখিরাতে আল্লাহর কাছে জবাবদিহীর জন্য। আমরা নিজেরা plan করে বাংলাদেশে জন্মগ্রহন করিনি। বরং আল্লাহ আমাদেরকে এ দেশে পাঠিয়েছেন। তাই এ দেশের মানুষকে সৎ, যোগ্য ও দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করার কাজ আমাদেরকেই করতে হবে। আর এভাবেই এ দেশকে সোনার বাংলায় পরিনত করতে হবে।
আমাদের নাম নিয়ে বা অতীতের কর্মকান্ড নিয়ে আমরা লজ্জিত নই। কোরান ও সুন্নাহর ভিত্তিতে যেহেতু আমরা পরিচালিত কাছেই সেটা নির্ভুল মানদণ্ড। মানুষ হিসাবে আমাদের কর্মকান্ডে যদি ভুল থাকে তাহলে আল্লাহ তওবার রাস্তা খোলা রেখেছেন। সংগঠনের কাজ পরিচালিত হয় পরামর্শের ভিত্তিতে। বলা হয়ে থাকে যারা এস্তেখারা এবং পরামর্শের ভিত্তিতে চলে তাদের লজ্জিত হতে হয় না।
ইসলাম কারো ব্যাক্তিগত বা দলগত বিষয় নয়। এটা বিশ্বমানবতার মুক্তি সনদ। এটা এসেছে সেই মহান আল্লাহর কাছ থেকে যিনি মনের গোপন বিষয়ও জানেন। অনেক ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে আমরা এই বাংলাদেশে অবস্থান করছি যেখানে আমরা স্বাধীন ভাবে নিজের কথা বলতে পারছি। কিন্তু স্বাধীনতার শত্রুরা ওৎ পেতে আছে এটা নস্যাৎ করার জন্য। ঐক্য বদ্ধভাবে এর মোকাবিলা করে গড়ে তুলতে হবে কাঙ্খিত সোনার বাংলা। যেখানে মানুষকে তার অধিকার বঞ্চিত হতে হবেনা ।
৬ জানুয়ারি ২০২৫ ইং